পল্লীশ্রী

বালুবাড়ী, দিনাজপুর।

নিরাপদ

পল্লীশ্রী একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন হিসেবে ১৯৮৭ সালের ০৪ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। পল্লীশ্রী বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন বিশেষ করে কিশোরীদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় উন্নয়ন সহযোগীতা ও বিভিন্ন তথ্য প্রযুক্তি ও সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করনের মধ্য দিয়ে যে অভিজ্ঞতা তাতে দেখা যাচ্ছে যে, পৃথিবীর যে সব দেশে শিশু বিয়ের হার সবচেয়ে বেশি, বাংলাদেশ তাদের মধ্যে অন্যতম। শিশু বিয়ে যে কোন কিশোরীর জীবনের এমন একটি ঘটনা, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে ঐ বিবাহিত কিশোরীর ব্যক্তিগত জীবনের সকল ক্ষেত্রে। আর এর সুদুর প্রসারী প্রভাব পড়ে বিবাহিত কিশোরীর নিজের ও সন্তানের স্বাস্থ্যের উপর, পরিবার, সমাজ এবং সর্বোপরি একটি রাষ্ট্রের শিক্ষা-স্বাস্থ্য-অর্থনীতির মত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাত গুলোতে। বিবাহিত কন্যা শিশুদের কখনোই শিশু হিসেবে স্বীকৃতি বা বিবেচনা করা হয় না। বিবাহিত হওয়ার পর তারা ঘরে আটকে যায় ও মেয়ে শিশু হিসেবে প্রতিনিয়ত তার অধিকার লঙ্ঘন করা হয় যা বরাবরই অদৃশ্য থেকে যায়।

 

পল্লীশ্রী উপরোক্ত বিষয়ের নেতিবাচক দিকগুলোকে বিবেচনা করে কমিউনিটি পর্যায়ে বিভিন্ন ভাবে সচেতনতার কাজটি করে চলেছে। বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ অনুযায়ী বিয়ের ক্ষেত্রে পূত্রের বয়স ২১ এবং কন্যার বয়স ১৮ বছরের কম হলে শিশু বিয়ে বলে গন্য হবে, যা একটি শাস্তি যোগ্য অপরাধ।  পল্লীশ্রী বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে নিরাপদঃ (নিজেকে রাখিব পরম দায়িত্বে) এই ক্যাম্পেইনটি শুরু করেছে। ক্যাম্পেইনটি মূলত পরিবার হতে কমিউনিটি পর্যায়ে সকল মানুষের অংশগ্রহনে। একটি শিশুর জন্ম নিবন্ধন বাধ্যতামূলক, হোক সে কন্যা বা পুত্র। পাশাপাশি কমিউনিটি পর্যায়ের সকল মানুষকে বাল্য বিয়ে সম্পর্কে সচেতনতা যেমন- বাল্য বিয়ের কুফল, এ সম্পর্কিত কু-সংস্কার, রাষ্ট্র নির্ধারিত বিয়ের সঠিক বয়স, রাষ্ট্রীয় আইন এবং টোল ফ্রি নম্বর, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা, গর্ভবতী মায়ের পরিচর্যা, প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্পর্কে বিশেষ আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করা, পাশাপাশি একজন কিশোর/কিশোরীর বিয়ের উপযুক্ত হওয়ার বয়স জন্ম সনদ অনুযায়ী নির্ধারন করা। অর্থাৎ তার জন্ম তারিখ হতে কন্যার জন্য ১৮ বছর এবং পুত্রের জন্য ২১ বছর পূর্ন হওয়ার দিনটি সম্পর্কে অবহিত থাকা। এ সম্পর্কিত তথ্যটি পল্লীশ্রী’র বাস্তবায়িত নারী ক্লাব সমূহে সংরক্ষিত ও উন্মুক্ত থাকবে এ বিষয়ে পরিবারের সদস্যগনকে সচেতনতাসহ পরিবারের কিশোর কিশোরীটিও যেন সচেতন হয় এবং আত্মবিশ^াস গড়ে তোলাসহ নিজেকে প্রস্তুত এবং চর্চায় পরিনত করা যায় সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহন করায় স্থানীয় নারী ক্লাব ও সিবিও সদস্যগন সহযোগীতা ও তদারকি করবে।

 

প্রয়োজনে স্থানীয় প্রশাসনের সাথে আলোচনা পূর্বক পরিষদ অবগত হবেন ও প্রয়োজনীয় সহযোগীতা করবেন। পরিবারের সদস্যগনকে সচেতনতাসহ পরিবারের কিশোর কিশোরীগন এ বিষয়ে সচেতন হয়ে পরিবারের অবগতি সাপেক্ষে নিজেদের নাম নিজেরাই তালিকা ভুক্ত করবেন।

 

নিরাপদ ক্যাম্পেইনের গৃহিত কার্যক্রম সমূহঃ

১. কিশোরী কিশোরীগন নিজেরাই নিজেদের নাম তালিকাভুক্ত করবেন।

২. ১২ থেকে ১৮ বছরের কিশোরী এবং ১২ থেকে ২১ বছরের কিশোরদের তালিকা তৈরী

৩. গ্রাম/ পাড়া ভিত্তিক পরিবার সমূহকে সচেতন করা

৪. হটলাইন নম্বর অবগত করা ১০৯, ৯৯৯, ৩৩৩, ১০৯৮

৫. স্থানীয় প্রশাসনকে অবগত করা ও প্রয়োজনীয় যোগাযোগ চলমান রাখা।

৬. প্রয়োজন সাপেক্ষে কিশোর-কিশোরীগন লেখাপড়া/শিক্ষা গ্রহনের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রশিক্ষনে, আয়মূলক কর্মকান্ডে অংশগ্রহন করতে পারে তার ব্যবস্থা নেয়া।

 

আমরা ক্যাম্পেইন কার্যক্রমটি বাস্তবায়ন শুরু করেছি, মানুষের সচেতনতা বাড়ছে পাশাপাশি কিশোরীদের স্কুলে ঝড়ে পড়ার হার কমছে এবং বাল্য বিয়ের সংখ্যাও নির্ধারিত এলাকায় কমে আসছে। একটি শিশু যেন তার পরিবার ও সমাজে নিজ আত্মবিশ^াসে বড় হতে পারে, নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে পারে। বিশেষকরে পরিবার ও সমাজের কারো দ্বারা বাল্য বিয়ের শিকার না হয়। তাই শিশু সুরক্ষায় আমরা নিরাপদ ক্যাম্পেইনটি প্রতিটি গ্রামে সকল মানুষের দায়বদ্ধতা তৈরীর মধ্য দিয়ে আপনার আমার শিশুদের বাল্য বিবাহ মুক্ত পরিবেশ তৈরীতে সহায়তা করতে পারি। সরকারি কর্মসূচীর সাথে সমন্বয় করে গ্রামে এই ক্যাম্পেইনটি চলমান রাখলে বাল্য বিবাহ বন্ধে একটি কার্যকর ভুমিকা রাখবে বলে আমরা আশাবাদি। সর্বোপরি একটি সচেতন পরিবারই হচ্ছে বাল্য বিবাহ বন্ধের মূল প্রতিষ্ঠান।

 

দিনাজপুরে নির্যাতনের শিকার নারীদের আত্মনিভরশীল হিসেবে গড়ে তুলছে উন্নয়ন সংগঠন “পল্লীশ্রী”

বিপুল সরকার সানি, দিনাজপুর

২০২২ সালে সদর উপজেলার রামডুবি সুন্দরপুর ইউনিয়নে তরুন চন্দ্রের সাথে বিয়ে হয় স্বপ্নার (ছদ্মনাম) বিয়ের সময় স্বপ্নার বাবা মেয়ে জামাইকে লাখ টাকা যৌতুক প্রদান করে। বিয়ের পর স্বামীর সাথে সুখেই কাটছিল তার সংসার কিন্তু তার স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয় বিয়ের এক বছরের মধ্যে, যখন তার স্বামী যৌতুকের জন্য আবারও তাকে চাপ দেয়। দিনমজুর বাবার অপারগতায় স্বপ্নার উপর শুরু হয় নির্যাতন। ২০২৩ সালে তার একটি মেয়ে সন্তান জন্মগ্রহণ করে। এরপর আরো বেড়ে যায় নির্যাতনের মাত্রা। মারধোরের ফলে হাসপাতালেও ভর্তি হতে হয়েছে স্বপ্নাকে। বারবার সালিশ, মিমাংসা কিন্তু নির্যাতন কমেনি। লিগ্যাল এইডে মামলা মিমাংসা হলেও অবস্থা একই। অবশেষে ২০২৪ সালে বাবার বাড়িতে চলে আসে স্বপ্না। বছর ধরে এখন বাবার বাড়িতেই আছে সে। মামলা চলমান, যৌতুকের টাকা ফেরত কিংবা স্ত্রী মেয়ের ভরনপোষন কিছুই দিচ্ছে না স্বামী। বর্তমানে স্বপ্না নিজের এবং মেয়ের  ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে কম্পিউটার গ্র্যাফিক্স প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছে।

                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                         

২০২০ সালে বিয়ে হয় একই উপজেলার রোখসানা খাতুনের (ছদ্মনাম) এক বছর পর তার মেয়ের জন্ম হয়। একেতো মেয়ে তার পর গায়ের রং শ্যামলা হওয়া  রোখসানাকে  বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। বারবার বিষয়টি মিমাংসা করে স্বামীর বাড়িতে গেলেও  চলে শারীরিক নির্যাতন। এক সময় জানতে পারেন স্বামী অন্য মেয়ের সাথে সম্পকে লিপ্ত  ।  ২০২২ সালে  তাকে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে ডিভোর্স লেটার পাঠায় স্বামী। পরে মামলা দায়ের করলে লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে দেনমোহরের টাকা পরিশোধ করলেও কন্যা সন্তানের কোন খোজ নেয়না এবং ভরনপোষন দেয় না। বর্তমানে সেলাই প্রশিক্ষণ নিয়ে বাড়িতেই অন্যের কাপড় সেলাই করে নিজের মেয়ের খরচ চালান তিনি।

শুধু এই দুটি ঘটনাই নয়, প্রতিনিয়তই যৌতুক  কিংবা বিবিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে নারীদেরকে। সালিশ, এমনকি মামলা করলেও সহসাই পাচ্ছেন না এর প্রতিকার। এখন নিজের পাশাপাশি সন্তানের ভরনপোষণ, সংসার নির্বাহ করাটাও কঠিন হয়ে দাড়িয়েছে মামলা পরিচালনা করার পাশাপাশি নিজেদেরকে স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তোলাটা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

দিনাজপুর নারী শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল বেসরকারী সংগঠন পল্লীশ্রীর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন জনেরও বেশি নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে দিনাজপুরে। অথচ এই জেলাতেই নারী নির্যাতন হত্যাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল বৃহৎ আন্দোলন, ইয়াসমিন ট্রাজেডী। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, বিচারকার্যে দীর্ঘসূত্রিতা, প্রায়োগিক ক্ষেত্রে দূর্বলতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারনে নির্যাতনের প্রবণতা বাড়ছে।

তথ্যানুযায়ী, গত ২০২৫ সালে এই জেলায় নারী শিশু নির্যাতনের অভিযোগ দায়ের হয় ৮১৪টি। যা প্রতিদিন গড়ে জনের বেশি। ২০২৪ সালেও নির্যাতনের সংখ্যা ছিল ১০৮৯টি এবং ২০২৩ সালে এই সংখ্যা ১৩৬৩টি।

নারী নির্যাতন প্রতিরোধ নারীর ক্ষমতায়নকে ফোকাস করে গড়ে ওঠা সংগঠন পল্লীশ্রী গত ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত মোট ৮৪৭ জন নিযাতনের শিকার নারীদেরকে নিয়ে কাজ করেছে। তাদের মধ্যে ৭৩৫টি অভিযোগ সালিশের মাধ্যমে সমাধান হয়েছে। শুধু সমাধানই নয়, নির্যাতনের শিকার নারীদেরকে স্বাবলম্বী করতে তাদেরকে দক্ষ ও উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলছে সংগঠনটি।

পল্লীশ্রীর কর্মকর্তারা বলছেন, নির্যাতনের অভিযোগ সমাধানের পাশাপাশি প্রয়োজন নারীদের সম্মান ও ন্যয্যতা পাওয়ার ব্যবস্থা ও সংসার নির্বাহ এবং তাদের সন্তানদের ভরনপোষনের জন্য তাদেরকে স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তোলা। প্রান্তিক  নারীদের অধিকার রক্ষা, তাদের অধিকার আদায়ের জন্য সুশীল সমাজের সংগঠন এবং সরকারী কর্তৃপক্ষকে সাথে নিয়ে  কাজ করে আসছে পল্লীশ্রী।

আর এসব নিযতনের শিকার নারীদেরকে স্বাবলম্বী করে তোলাটা অনেক চ্যালেঞ্জিং  তথাপিও   গত এক বছরে পল্লীশ্রী  ৯৭ জন নিযাতনের শিকার নারীর সাথে কাজ করেছে। তাদের মধ্যে পারিবারিক নির্যাতনের শিকার ৩৩ জন, যৌতুকের জন্য নির্যাতনের শিকার ১৫ জন, শারীরিক নির্যাতনের শিকার ২৯ জন। এছাড়াও জমিজমা সংক্রান্ত, মানসিক নির্যাতন, বাড়ি থেকে বের করে দেয়া, যৌন হয়রানী, পরকীয়ায় নির্যাতনসহ বিভিন্ন ভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন আরও ২০ জন নারী। গত এক বছরে ১১৫ জন নারীকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলেছে পল্লীশ্রী। তাদের মধ্যে ৪৭ জন সেলাই প্রশিক্ষণ নিয়ে দর্জি হয়েছেন, জন কসমেটিকসের দোকান দিয়েছেন, জন ফেরী ব্যবসা করছেন, ১৫ জন ব্যাগ তৈরী করছেন, অনলাইনে কাপড়ের ব্যবসা করছেন জন, দুধের ব্যবসা করছেন জন, হোটেল চায়ের দোকান ১৪ জন, করুস কাটা (সুতা দিয়ে কাপড় তৈরী) জন, পিঠার দোকান একজন এবং মুদির দোকান করছেন ২০ জন নারী।

নারী নির্যাতন প্রতিরোধে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করার অভিজ্ঞতায় সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক শামীম আরা বেগম জানান, বিচারকার্যে দীর্ঘসূত্রিতা, প্রায়োগিক ক্ষেত্রে দূর্বলতার কারনে নির্যাতনের প্রবণতা বাড়ছে। এজন্য দ্রুত বিচার আইনের মাধ্যমে এসব মামলা পরিচালনা  আপরাধী যেই হোক তাকে দ্রুত বিচার আইনের মাধ্যমে তার শাস্তি কাযকর করতে হবে। নারীরা পরনির্ভরশীল না হলে নির্যাতনের মাত্রা এমনিতেই কমে আসবে। এজন্য আমরা কাজ করছি এসব নারীরা যাতে  স্বাবলম্বী হতে পারে সে জন্য  বিভিন্ন প্রশিক্ষণ  প্রদান ও প্রশিক্ষন  পরবতি সংগঠনের স্বক্ষমতা অনুযায়ী প্রারম্ভিক পুজি প্রদান সহ  তাদেরকে দক্ষ করে গড়ে তোলা যাতে করে তারা নিজের পায়ে দাড়াতে পারে এবং বিভিন্ন সরকারী বা বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে তাদেরকে সম্পৃক্ত করে দেওয়া হচ্ছ ফলে অনেকেই নিজেদেরকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলছেন।